‘ভোট চুরির’ অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের পদযাত্রা
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশ্যে পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে স্মারকলিপি পেশ ও তার সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা করেছে দলটি। তবে প্রধান বিচারপতি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে মামলা ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের তারিখ নির্ধারণের দাবিতে তাদের নেতারা দিল্লি পুলিশের সঙ্গে দেখা করবেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারিখ ঘোষণা না করা হলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরুর হুমকিও দিয়েছে সংগঠনটি। এর আগে সপ্তাহান্তে কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের অভিযানে সিজেপি ও বামপন্থী ছাত্রনেতাসহ হাজার হাজার মানুষ আটক হন।
৬২ বছর বয়সী জ্ঞানেশ কুমার ১৯৮৮ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে (আইএএস) যোগ দেন। উত্তর প্রদেশের একটি সরকারি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারত-শাসিত কাশ্মীর বিষয়ক বিভাগে যোগ দেন। জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিলের খসড়া তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে ওই আইনের মাধ্যমে অঞ্চলটির আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করা হয়।
একই বছর অযোধ্যায় মুঘল আমলের একটি মসজিদের জায়গায় হিন্দু মন্দির নির্মাণের পথ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে উন্মুক্ত হওয়ার পর রায় বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা একটি দলের প্রধান করা হয় কুমারকে। মন্দির নির্মাণ তদারকির জন্য একটি ট্রাস্ট গঠনও ছিল ওই দলের দায়িত্বের অংশ। চলতি বছর ওই ট্রাস্টের বিরুদ্ধে মন্দির নির্মাণের জন্য পাওয়া বিপুল অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান কুমার। এর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ভারতের সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক এক দিন আগে, তাঁকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হন। ২০২৩ সালের একটি আইনের আওতায় নিয়োগ পাওয়া প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার তিনি। ওই আইনে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্যানেল থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে তাঁর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নিয়োগের সময় প্যানেলের সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কুমারের নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন। ২০২৩ সালের আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দুই বিচারপতির একটি বেঞ্চ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বেঞ্চে বিবেচনার সুপারিশ করে।
বিরোধীদের বর্তমান আন্দোলনের মূল কারণ নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কার্যক্রম। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মুসলিমসহ লাখ লাখ যোগ্য ভোটার ভোটাধিকার হারিয়েছেন। ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনী ফল নিজেদের অনুকূলে নিতে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এ কার্যক্রম ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
গত মাসে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন ও অন্যান্য পদ্ধতিগত বিষয়ে কুমারের দুই ডেপুটি ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়েও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা বিজেপির জেতা সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তবে কুমার এ অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করেননি। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পদযাত্রা ঘিরে নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। আজ ছয়টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীতে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মধ্য নয়াদিল্লির সংযোগকারী সড়কগুলোতে বসানো হয়েছে শত শত হলুদ ধাতব ব্যারিকেড।
What's Your Reaction?