সিটি গ্রুপের ঋণ এখনই খেলাপি না করার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

Oct 26, 2026 - 12:02
 0  6
সিটি গ্রুপের ঋণ এখনই খেলাপি না করার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের ঋণ আপাতত খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিল্পগোষ্ঠীটিকে আর্থিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা সচল রাখতে নতুন করে মূলধন জোগানের লক্ষ্যে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন, ঋণদাতা কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে তা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কয়েকটি ব্যাংক ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রুপটির ব্যবসা যাতে আরও সংকটে না পড়ে, সে জন্য আপাতত ঋণ খেলাপি না করার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বৈঠকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খানসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা।

বৈঠকের বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সিটি গ্রুপ আগে কখনো ঋণখেলাপি হয়নি এবং গ্রুপটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। এ কারণে সবাই চায়, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান সংকট কাটিয়ে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুক। ঋণদাতা ব্যাংকগুলোও গ্রুপটিকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ ব্যাংকও এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে শিল্পগোষ্ঠীটির আর্থিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে প্রতিষ্ঠানটি আবার আগের অবস্থানে ফিরতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগে গতকাল জাতীয় অর্থনীতিতে ‘সিটি গ্রুপের বিশাল ঋণ নিয়ে মুখোমুখি শীর্ষ ব্যাংক এমডিরা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে উঠে আসে, দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ নিয়ে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এক পক্ষ ঋণ পুনঃতফসিল করে নতুন করে ঋণপত্র বা এলসি খোলার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখতে চায়। অন্য পক্ষের মতে, নতুন অর্থায়নের আগে কারখানা ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তাদের আশঙ্কা, পুরোনো ঋণের সুরাহা না করে নতুন করে অর্থায়ন করা হলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, আগের নির্দেশনার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কয়েকটি ব্যাংক সিটি গ্রুপের ঋণ নতুন করে খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। কোনো একটি ব্যাংকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে অন্য ব্যাংক থেকেও ঋণসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হয়। ফলে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে গ্রুপটির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, সিটি গ্রুপকে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ধারায় ফিরিয়ে আনতে বৈঠকে বিভিন্ন পরামর্শ উঠে এসেছে। গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখার বিষয়ে ব্যাংকগুলো সচেষ্ট এবং সবাই চায় প্রতিষ্ঠানটি সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াক।

অন্যদিকে, ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানান, ঋণখেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হলে ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান জানান, চলতি মাসের মধ্যে সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়মিত করার লক্ষ্যে এককালীন কিছু অর্থ জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাব পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রস্তাব অনুমোদন করলে গ্রুপটির আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow