বিশেষ ধারের টাকায় ঋণ দিতে পারবে না ন্যাশনাল ব্যাংক
ধুঁকতে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ১১ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের বিপরীতে দুই হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার সোনালী ব্যাংক থেকে বিশেষ ধার হিসেবে পাওয়া সাত হাজার কোটি টাকায় আজ বৃহস্পতিবার থেকে আমানতকারীর অর্থ পরিশোধ করা হবে। এই টাকা থেকে নতুন ঋণ দিতে পারবে না ন্যাশনাল ব্যাংক। সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের আমানত থাকলে তাও পরিশোধ করা যাবে না। এ রকম বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য সাত হাজার কোটি টাকার ধার দিয়েছে। দশ শতাংশ সুদে ব্যাংকটি এ অর্থ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে। এখান থেকে কোথায় কী অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে প্রতি সপ্তাহে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্ট দিতে হবে। ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থ দিতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা পরিশোধ করে দেবে। অর্থ দেওয়ার আগে বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। শর্ত পরিপালন বিষয়ে গত ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। এর আগে বিশেষ ধার নিয়ে আর ফেরত দিতে না পারায় বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা পাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের অনিয়ম-দুর্নীতির প্রভাবে ব্যাংকটি দাঁড়াতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ব্যাংকটির নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি রয়েছে ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ জমা রাখতে না পারায় বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্তে যা
বাংলাদেশ ব্যাংক এই গ্যারান্টির টাকা খরচ করার ক্ষেত্রে মোট ১১টি শর্ত দিয়েছে। শর্তের মধ্যে আছে গ্যারান্টির কোনো দায় অপরিশোধিত থাকা অবস্থায় ন্যাশনাল ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এই অর্থ দিয়ে ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কোনো পরিচালক ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো ধরনের ঋণ দেওয়া যাবে না। এমনকি ব্যাংকের সাবেক বা বর্তমান পরিচালকদের নামে বা বেনামে রক্ষিত আমানত পরিশোধ করতে নিষেধ করা হয়েছে। গ্যারান্টি অর্থে কোনো নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ দেওয়া যাবে না। বর্ধিত করা যাবে না বিদ্যমান ঋণ। আগে অনুমোদিত ঋণসীমা থেকে অবিতরণকৃত অংশ বিতরণ করা যাবে না। ব্যাংকের বিদ্যমান আন্তঃব্যাংক দায় বা প্লেসমেন্টের অর্থ এখান থেকে পরিশোধ করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্তে আরও আছে– বিশেষ এই ধারের টাকায় অন্য ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ অধিগ্রহণ করা যাবে না। ফোর্সড ঋণ বা এলটিআর সৃষ্টির মাধ্যমে এলসি দায় পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনা যাবে না। এই টাকা দিয়ে অন্য ব্যাংকে প্লেসমেন্ট বা ডিপোজিট করা যাবে না। গ্যারান্টি বলবৎ থাকা অবস্থায় এখান থেকে নতুন সংগৃহীত আমানত তারল্য পরিস্থিতি উন্নয়নে (সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণ) ও আমানতের দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না পরিচালন ব্যয়। গ্যারান্টিকৃত অর্থ থেকে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা যাবে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো বিভাগ কোনো নির্দেশনা দিলে তাও পরিপালন করতে হবে।
এক সময় বেসরকারি খাতের অন্যতম সেরা ব্যাংক ছিল ন্যাশনাল। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল ব্যাংকটির পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যায় জয়নুল হক সিকদার পরিবারের হাতে। নিয়মবহির্ভূতভাবে এক পরিবার থেকে পাঁচজন পরিচালক, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিপরীতে ঋণ, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়নুল হক সিকদার মারা যাওয়ার পর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের সন্তানদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। শুরুতে অন্য একটি ব্যাংকের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে সিকদার পরিবারের সবাইকে সরিয়ে এনবিএলের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ পতনের পর ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
What's Your Reaction?