পানি-তেলে ‘ফুঁ’ দেন হুজুর, দানবাক্সে পড়ে লাখ টাকা
এক হাতে পানির গ্লাস আর অন্য হাতে তেলের বোতল নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন নুরজাহান বেগম। তাঁর সামনে হাজারো মানুষের সারি। বয়সের ভারে ঠিকমত হাঁটতে পারেন না। এরপরও লাইনে দাঁড়িয়েছেন হুজুরের ‘পানি পড়া’ নিতে। বাহাত্তর বয়সী এই নারী এসেছেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা থেকে। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা নামবে। এখনও পানি পড়া পাননি তিনি। ভাবছেন ‘পানি পড়া’ নিয়ে বাড়ি ফিরবেন কীভাবে।
হুজুরের ‘ফুঁ’ দেওয়া পানি খেলে ভালো হবে জটিল সব রোগ–এমন বিশ্বাসে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন মানুষ। হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মের মানুষই ছুটছেন এমন বিশ্বাসে। ভিড়ের মধ্যে ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। যানজটসহ নানা সমস্যায় পড়েছেন এলাকাবাসী।
শুক্রবার এলেই জাহিদুল ইসলাম হুজুরের (২৮) ‘ফুঁ’ দেওয়া পানি ও তেল পড়া নেওয়ার এমন দৃশ্য দেখা যায় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তালঘড়িয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায়।
গত শুক্রবার বিকেলে তালঘড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রবেশমুখে দীর্ঘ যানজট। শত শত রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস গ্রামের দিকে যাচ্ছে। মাদ্রাসাসংলগ্ন এলাকায় গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছেন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। সবার হাতে তেলের বোতল ও পানির গ্লাস। তারা চেষ্টা করছিলেন হুজুরের সঙ্গে কথা বলতে। চারপাশে চিৎকার-চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি। উপস্থিত নারী-পুরুষদের উদ্দেশ্যে মাইকে বলা হচ্ছে–দান না করলে দোয়া কবুল হয় না। এতিমখানার জন্য দানবাক্সে কিছু দান করে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, প্রতি সপ্তাহে এক লাখ টাকার বেশি দান বাক্সে জমা হয়। দানবাক্সের অর্ধেক টাকা হুজুরকে দিতে হয়। সেই শর্তে তিনি এখানে পানি পড়া দেন। এছাড়া তেলের বোতল ও পানির গ্লাস বিক্রি বাবদ আরও লক্ষাধিক টাকার কারবার এখানে।
তালঘড়িয়া গ্রামের অন্তত ১০ জন বাসিন্দা জানান, জাহিদুল অনেক দিন ধরে তেল-পানিতে ‘ফুঁ’ দেন। কারও কারও উপকার হয়েছে, এমন বিশ্বাস থেকে লোকজনের মধ্যে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। তবে কে সুস্থ হয়েছেন, এমনটি কেউ বলতে পারেননি।
দিনাজপুরের বিরামপুরের দেলুয়াবাড়ি গ্রামের মকলেছুর রহমান (৭০) পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে হুজুরের কাছে নিয়ে এসেছেন পরিবারের লোকজন। তারা জানান, লোকমুখে শুনে তেল পড়া নিয়েছেন। বাড়িতে গিয়ে মালিশ করবেন।
ভাগনদী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আক্কাস আলীর বয়সজনিত নানা অসুখ রয়েছে। হাতে থাকা পানির গ্লাসটি খালি, বললেন ‘ফুঁ’ দেওয়া পানি খেয়েছেন। হাত-পা ফোলার সমস্যার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে পানি খাচ্ছেন তিনি। তবে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মিজানুর রহমান বলেন, পড়া পানিতে কাজ না হওয়ায় তাঁর কাছ থেকেও চিকিৎসা নিচ্ছেন আক্কাস আলী।
গোপীনাথপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম হুজুর বলেন, এ ধরনের কাজ শিরকের পর্যায়ে পড়ে। মানুষ কেন যে এগুলো বিশ্বাস করে, আমার বুঝে আসে না।
জাহিদুল ইসলামের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গার আবদানপুরে। তাঁর প্রতিবেশী ইয়াদ আলী জানান, কিছু দিন আগেও অটোরিকশা চালাতেন জাহিদ, এখন দামি গাড়ি চালান। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, জাহিদ পার্শ্ববর্তী চেওখালী জামে মসজিদে ইমামতি করেন। প্রথমে তিনি মসজিদ প্রাঙ্গণে ‘পানি পড়া’ দিতেন। ‘পানি পড়ার’ দিন দানবাক্সে যে টাকা জমা পড়ত তা থেকে বিশ হাজার টাকা তাঁকে দেওয়া হতো। তবে ভাগ নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তিনি এখন তালঘড়িয়াতে ‘পানি পড়া’ দিচ্ছেন।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, পানি পড়ায় রোগ ভালো হওয়ার কোনো ভিত্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই। কেউ যদি এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে আমরা প্রশাসনিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে ‘পানি পড়া’ দেওয়া জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি কাউকে তেল-পানি পড়া নেওয়ার জন্য দাওয়াত দিই না। যারা আল্লাহর কালাম বিশ্বাস করেন, তারা আমার কাছে আসেন। আমি আল্লাহর কালাম পড়ে তেল-পানিতে ‘ফুঁ’ দিয়ে দিই মাত্র।’ নাটোরের কান্দিভিটা মাদ্রাসা থেকে হাফেজি সম্পন্ন করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
What's Your Reaction?