মেসির জাদুতে শেষ মুহূর্তের জোড়া গোল, আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও™ আর্জেন্টিনা প্রমাণ করে দিল যে, খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অধিনায়ক লিওনেল মেসির এক রূপকথার মতো ও অনুপ্রেরণাদায়ী পারফরম্যান্সে, আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা আগামী রবিবার নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে (ইস্ট রাদারফোর্ড) শিরোপার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে। সেখানে তারা ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জয় এবং নিজেদের ইতিহাসের চতুর্থ তারকা (১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ সালের সাফল্যের পর) অর্জনের লক্ষ্যে মাঠে নামবে। অন্যদিকে, থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডকে আগামী শনিবার ফ্রান্সের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল মূলত দুই দলের ট্যাকটিক্যাল এবং শারীরিক শক্তির এক তুমুল লড়াই। ইংলিশরা তাদের মধ্যমাঠে এক নিরেট দেয়াল তুলে রেখেছিল; এলিয়ট অ্যান্ডারসন সার্বক্ষণিকভাবে মেসির নড়াচড়া রুখে দিচ্ছিলেন এবং হ্যারি কেইন কিছুটা নিচে নেমে এসে আর্জেন্টিনার পাসিং লাইনগুলো বন্ধ করে দেন। এই অতিরিক্ত ফাউল ও শারীরিক ফুটবলের কারণে প্রথমার্ধে মোট ১৯টি ফাউল হলেও গোলমুখে শট ছিল মাত্র ৩টি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই এই ব্রিটিশ রক্ষণাত্মক কৌশল ফলপ্রসূ হয়। ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে মরগান রজার্সের এক নিখুঁত ক্রস থেকে বল জালে জড়ান অ্যান্থনি গর্ডন। এর মাধ্যমে ইংল্যান্ড ম্যাচে লিড নেয় এবং থ্রি লায়ন্স সমর্থকদের মনে ফাইনালের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে।
এই গোলের পর থেকেই আলবিসেলেস্তেরা সমতায় ফেরার জন্য তাদের আক্রমণের সব শক্তি ঢেলে দেয়। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে নিকোলাস গঞ্জালেসের এক দুর্দান্ত হেড রুখে দেন ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড, এবং ৭৬ মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে আর্জেন্টিনার অদম্য স্পিরিটের কাছে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে হার মানতেই হয়েছে।
ম্যাচের সময় যখন ফুরিয়ে আসছিল এবং ঘড়ির কাঁটা ৮৫ মিনিট ছুঁয়েছিল, ঠিক তখনই জ্বলে ওঠে লিওনেল মেসির ফুটবল মস্তিষ্ক। একটি শর্ট কর্নার থেকে বল পেয়ে বক্সের ঠিক বাইরে থাকা এনজো ফার্নান্দেজকে নিখুঁত এক পাস দেন লিওনেল মেসি। এনজোর নেওয়া বুলেট গতির শট পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে জালে জড়ালে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা।
এই গোলের পর মানসিকভাবে চাঙ্গা আর্জেন্টিনা ইনজুরি টাইমে (৯০+২ মিনিট) সৃষ্টি করে এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনার। ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসার পর, রিবাউন্ড থেকে বল পান মেসি। তিনি বক্সে এক মাপা ক্রস বাড়ান, যেখানে ওত পেতে থাকা লাউতারো মার্টিনেজ এক বুলেট হেডে বল জাল পাঠান। ২-১ গোলের এই মহানাটকীয় জয়ে আটলান্টার গ্যালারিতে তখন শুধুই আর্জেন্টিনার উৎসব।
"আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এই দলটা চাপের মধ্যেই তাদের সেরা ফুটবলটা খেলে," ম্যাচ শেষে আবেগপ্লুত হয়ে বলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। "যখন আমরা ভুগি এবং প্রতিপক্ষ কিছুটা দ্বিধায় থাকে, আমরা সুযোগের সন্ধান পাই এবং নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এরা এমন সব যোদ্ধা যারা কাউকে ভয় পায় না।"
এই ম্যাচে দুটি অ্যাসিস্ট করার মাধ্যমে লিওনেল মেসি শুধু তার দলকে ফাইনালেই নিয়ে যাননি, বরং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের দৌড়েও নিজেকে সবার চেয়ে এগিয়ে রাখলেন। চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তার নামের পাশে রয়েছে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট। শেষ মুহূর্তে ম্যাচ নিজেদের করে নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা এবার এক নতুন রেকর্ড গড়েছে—চলতি বিশ্বকাপে ৭৫ মিনিটের পর তারা মোট ১১টি গোল করেছে।
What's Your Reaction?












