মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং দৃষ্টিনন্দন বহু ভবনের চকচকে মেগা প্রকল্প দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের সবচেয়ে অবাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় আবারও তলানিতে ঠাঁই পেয়েছে রাজধানী ঢাকা। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২২ বছর ধরে প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম স্থানে নেমে এসেছে। ঢাকার পেছনে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপলি, আর ঠিক ওপরে ১৭০তম অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের করাচি। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় বড় ভৌত অবকাঠামোর ঝলকানি বাড়লেও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি।
ইআইইউর বাসযোগ্যতা পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ‘অবকাঠামো’ খাতে এবার ঢাকা ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৭ নম্বর পেয়েছে। সড়ক, সুশৃঙ্খল গণপরিবহন, মানসম্মত আবাসন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং আধুনিক টেলিযোগাযোগ সেবার ওপর ভিত্তি করে এই সূচক নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতে দেশের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের মোবাইল ফোন ও ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও নেটওয়ার্ক ও স্পেকট্রামের নিম্নমানের কারণে গ্রাহকরা আধুনিক সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন বলে মত দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাশেদ মেহেদী। অন্যদিকে, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হকের মতে, মেট্রোরেলে ৪ লাখ মানুষ যাতায়াত করলেও সড়কে লাখ লাখ অনিয়ন্ত্রিত বাহন ঢুকে বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে, যা নাগরিকদের দৈনন্দিন যাতায়াতকে চরম ভোগান্তিতে রূপ দিয়েছে।
রাজধানীর বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার পেছনে পানি ও আবাসনের সংকটকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়াটার এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান জানান, ওয়াসা চাহিদার চেয়ে বেশি পানি উৎপাদনের দাবি করলেও সরবরাহ করা পানি ফোটানো ছাড়া সরাসরি পানের উপযোগী নয় এবং পাইপলাইনে ময়লা ঢোকায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। একই সাথে লোডশেডিংয়ের প্রভাব সরাসরি পানির পাম্পগুলোতে পড়ছে। পাশাপাশি রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, দুই কোটি দশ লাখ নগরবাসীর মধ্যে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ মানুষ ভাড়া বাসায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বাস করেন এবং পার্ক, খেলার মাঠ ও বিশুদ্ধ বায়ুর মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধার চরম অভাব রয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে পরিকল্পনায় অন্যায্য আপস এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) বারবার সংশোধনের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সতর্ক করে দেন যে, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা গেলে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও ঢাকার বাসযোগ্যতার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে না।