৯ মাস পর পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্টমার্টিন, উচ্ছ্বসিত দ্বীপবাসী

Oct 28, 2026 - 12:22
 0  4
৯ মাস পর পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্টমার্টিন, উচ্ছ্বসিত দ্বীপবাসী

বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির মাঝে জেগে থাকা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। স্থানীয়দের কাছে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। দীর্ঘ ৯ মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলছে দ্বীপটি। পর্যটকদের আগমনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আনন্দিত দ্বীপবাসী। তবে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও সি অ্যাম্বুলেন্স স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস সেন্টমার্টিনে। দ্বীপটিতে রয়েছে একটি ইউনিয়ন পরিষদ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, তিন থেকে চারটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি পুলিশ ফাঁড়ি। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও দ্বীপটি সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে ১৫৪ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ৬৮ প্রজাতির প্রবালসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী। দ্বীপটির ভূতাত্ত্বিক গঠন চুনাপাথরসমৃদ্ধ। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন-সংলগ্ন সমুদ্রের তলদেশে বিভিন্ন ধরনের ভারী খনিজ উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। পর্যটকদের থাকার জন্য দ্বীপে গড়ে উঠেছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি হোটেল ও রিসোর্ট।

টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার, আর কক্সবাজার থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। সড়কপথে দ্বীপটিতে যাওয়ার সুযোগ নেই; যেতে হয় সমুদ্রপথে। যাত্রাপথে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল, স্বচ্ছ নীল জলরাশি, সারি সারি নারিকেলগাছ এবং চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। টেকনাফ থেকে দ্বীপে যাতায়াতের জন্য দমদমিয়া জেটি, টেকনাফ কাইয়ুকখালী জেটি ঘাট ও শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাট ব্যবহৃত হয়।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে পর্যটকদের জন্য কয়েকটি শর্ত নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ জন পর্যটক দ্বীপটিতে যেতে পারবেন। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ১২ অক্টোবরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পর্যটকদের দিনে গিয়ে সেদিনই ফিরে আসার নির্দেশনা ছিল। তবে সোমবার (২৭ অক্টোবর) নেওয়া নতুন সিদ্ধান্তে সেই নির্দেশনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন পর্যটকেরা দ্বীপে রাতেও অবস্থান করতে পারবেন।

দীর্ঘ ৯ মাস পর পর্যটকদের যাতায়াতের অনুমতি পাওয়ায় আনন্দ মিছিল করেছেন দ্বীপবাসী। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দ্বীপের মানুষের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বড় একটি অংশ পর্যটন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে পর্যটকদের আসার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁরা আনন্দিত এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের আসার সুযোগ করে দেওয়ায় দ্বীপবাসী সরকারকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে বর্ষা মৌসুমে দ্বীপের ভাঙন রোধে চারপাশে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের বরণ করতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। এ জন্য সেন্টমার্টিনের হোটেল মালিক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে, যাতে পর্যটকেরা নিরাপদে দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারেন। পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও সি অ্যাম্বুলেন্সের অভাব

পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সেন্টমার্টিনে প্রায় ১৫০টি উন্নত মানের হোটেল ও রিসোর্টসহ অসংখ্য দোকানপাট গড়ে উঠেছে। কিন্তু দ্বীপটিতে নেই কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। ফলে হোটেল, রিসোর্ট, দোকান কিংবা বসতবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ রয়েছে। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আজিম বলেন, সেন্টমার্টিনকে কেন্দ্র করে অনেকেই ব্যবসা করছেন, কিন্তু দ্বীপের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। কোনো বাড়ি, হোটেল, রিসোর্ট বা দোকানে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্বীপে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, দ্বীপে উন্নত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফে নেওয়ার জন্য সি অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখনো এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা চালু হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি রোগী ও প্রসূতি মায়েদের সমুদ্রপথে টেকনাফে নিতে সাধারণ নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়। জোয়ার-ভাটার কারণে অপেক্ষা করতে হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোগী ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, পর্যটন মৌসুমে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে টেকনাফে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দ্বীপে সি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনে সমস্যা হয়। তাঁদের ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও উন্নত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। তাই অন্তত পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিনে একটি সি অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি।

পর্যটকদের আগমন ঘিরে সেন্টমার্টিনে নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আশা তৈরি হয়েছে। তবে পর্যটনশিল্পের বিকাশের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow