এক দশকে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়: তবুও ঢাকায় এক বছরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ
রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও প্রাণহানি দুটোই প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের বড় অংশই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। মশা নিধনে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ ও খরচ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে অভিযোগ নাগরিকদের। চলতি বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ঢাকাবাসী।
বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দুই সিটি করপোরেশনের চরম উদাসীনতা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকি না থাকা, লার্ভার উৎসে সঠিকভাবে কীটনাশক না ছিটানো এবং কর্মচারীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের কারণে মশার লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না।
মশক নিধনের বাজেট ও ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্র
বিগত এক দশকে মশা দমনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও প্রাণহানি:
-
বিপুল বাজেট বরাদ্দ: ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই সিটিতে মশক নিধনে মোট বরাদ্দ ছিল ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৭ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় (ডিএনসিসিতে ২০৭ কোটি ও ডিএসসিসিতে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা)। গত দশ বছরে মশা মারতে সরকারের ব্যয় ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
-
সংক্রমণের উল্লম্ফন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৩ জন এবং মারা যান ১,৫৫১ জন। আর ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই সিটিতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ১১,৭৮৭ জন এবং মৃত্যু হয় ১১৪ জনের। অন্যদিকে চলতি ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬,৪৬৫ জনে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৯.৭ শতাংশ বেশি।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে অনিয়ম ও ওষুধ সংকট
মাঠপর্যায়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে মশার ওষুধ ছিটানোর প্রক্রিয়ায় চরম সমন্বয়হীনতা ও দায়সারা কাজের চিত্র দেখা গেছে।
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি এলাকায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট রুটিনে অন্তত চার ঘণ্টা ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা এক ঘণ্টাও করা হয় না। কর্মচারীদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় খুব সামান্য পরিমাণ ওষুধ দেওয়া হয়, ফলে কেবল মূল সড়ক বা স্পেশাল ভবনের সামনে ওষুধ ছিটানোর পরই তা শেষ হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে পুরান ঢাকা, মুগদা, মান্ডা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও রামপুরার ঘনবসতিপূর্ণ অলিগলিতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ওষুধ পৌঁছায় না। এছাড়া কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, বরাদ্দের কীটনাশক কালোবাজারে বিক্রি ও জ্বালানি সংকট কৃত্রিম সমস্যা তৈরি করছে।
প্রতিকার ও করপোরেশনগুলোর বিশেষ পদক্ষেপ
নগরবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, শুধু ফগিং বা ওপরে ওষুধ ছিটিয়ে মশা মারা অসম্ভব; বরং ড্রেন, খালের পাড় ও জলাশয়ে এডিস মশার লার্ভিসাইডিং জোরদার করতে হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ৯০ দিনের বিশেষ সচেতনতা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে লিফলেট বিতরণ করছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রতি শনিবার 'ক্লিনিং ডে' পালন করা হচ্ছে। ৭৫টি ওয়ার্ডেই জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র ও টায়ার অপসারণের মাধ্যমে এডিস লার্ভা ধ্বংসের চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
What's Your Reaction?