ধার করা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডেই নির্মাণ দেশের বৃহৎ সব সেতু

Sep 14, 2026 - 13:02
 0  8
ধার করা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডেই নির্মাণ দেশের বৃহৎ সব সেতু

নব্বইয়ের দশকের আগে দেশে বড় কোনো সেতু ছিল না। পরের দুই দশকে চালু হয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বড় সেতু মেঘনা, মেঘনা-গোমতী ও যমুনা সেতু। এরপর দেশের সড়ক অবকাঠামোর দ্রুত উন্নয়নের ফলে মাঝারি আকারের বিভিন্ন সেতু নির্মাণ হতে থাকে। সর্বশেষ নির্মাণ করা হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু। এরপর উদ্বোধন করা হয় দ্বিতীয় মেঘনা, দ্বিতীয় গোমতী ও দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু। এখন আলোচনা চলছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু ও বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণ নিয়ে।

দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য সম্প্রতি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে চুক্তি করেছে সরকার। যদিও দেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নিজস্ব কোনো ব্রিজ ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড (কোড) নেই। তাই বড় বা মাঝারি আকারের সেতু বানাতে কখনও অনুসরণ করা হয় জাপানের স্ট্যান্ডার্ড, কখনও বা যুক্তরাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ব্রিজ ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডও অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ ধার করা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডে বৃহৎ সব সেতু বানাচ্ছে বাংলাদেশ।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত দেশের সর্ববৃহৎ সেতুর নকশা প্রণয়নে অনুসরণ করা হয় ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড ম্যানুয়াল। এছাড়া যমুনা সেতুতের নকশা প্রণয়নেও অনুসরণ করা হয় ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড ম্যানুয়াল। আর শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু তিনটির নকশা প্রণয়নে অনুসরণ করা হয়েছে জাপানের স্ট্যান্ডার্ড। এছাড়া প্রথম মেঘনা ও প্রথম গোমতী সেতু নির্মাণেও জাপানের স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হয়েছিল।

এদিকে দক্ষিণাঞ্চলে রূপসা নদীর ওপর নির্মিত দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রেল সেতুর নকশায় অনুসরণ করা হয়েছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের স্ট্যান্ডার্ড। দেশের সর্ববৃহৎ রেল সেতু (যমুনা রেল সেতু) নির্মাণে অনুসরণ করা হয়েছে জাপানের স্ট্যান্ডার্ড। আবার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুতে অনুসরণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড। নির্দিষ্ট কোনো স্ট্যান্ডার্ড ছাড়া এভাবেই একের পর এক নির্মাণ করা হয়েছে দেশের বড় সেতুগুলো। এতে নকশায় ত্রুটিসহ নানা ধরনের জটিলতাও তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত যে দেশের পরামর্শক নকশা প্রণয়নের কাজ করে মূলত সে দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হচ্ছে সেতুতে। এতে একদিকে সেতু নির্মাণে নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। আবার সেতুগুলোর নির্মাণ পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণও দেখা দিচ্ছে জটিলতা।

‘ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব ব্রিজস ইন বাংলদেশ: ইন দ্য পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্য তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম সাইফুল আমীন ও জাপানের সাইতামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াই. ওকুই। এতে গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে নির্মিত বিভিন্ন সেতুর নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে সেতু নির্মাণে কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় ডিজাইন কোড বা স্ট্যান্ডার্ড নেই। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড ‘দ্য আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব স্টেটস হাইওয়ে অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অফিসিয়ালস’ বা এএএসএইচটিও-এর স্পেফিকিশেন অনুসরণ করে। বাংলাদেশে ১৯৯২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেতু নির্মাণে বিভিন্ন ডিজাইনার এএএসএইচটিও-এর বিভিন্ন সংস্করণ ব্যবহার করেছেন। ইন্ডিয়ান রোডস কনগ্রেস (আইআরসি) স্পেফিকিশেনও মাঝে মাঝে ব্যবহার করা হয়।

বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ১৯৯২ সালে প্রণীত ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড (বিএস) ৫৪০০ অনুসরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম যমুনা ও পদ্মা সেতু। দেশের বৃহৎ এ দুই সেতুতে বিএস ৫৪০০ অনুসরণ করা হয়েছে। আবার দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতুর নকশায় জাপান রোড অ্যাসোসিয়েশনের (জেআরএ) প্রভিশনস ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এতে ১৯৯৩ সালের বিল্ডিং কোডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাতাসের গতিবেগ ও ভূমিকম্পের মাত্রার সমন্বয় করা হয়েছে। অর্থাৎ এএএসএইচটিও, বিএস, জেআরএ বা আইআরসি যেক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হয় সেক্ষেত্রে ১৯৯৩ সালের বিল্ডিং কোডের ব্যবহার করা হয়।

একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে ‘রিসেন্ট ট্রেন্ড অ্যান্ড ফিউচারিসটিক ভিশন অব ব্রিজ ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে। যৌথভাবে এটি প্রণয়ন করেন বাংলাদেশ গ্রুপ অব আইএবিএসই’র চেয়ারম্যান এম এ সোবহান ও বুয়েটের অধ্যাপক এ এফ এম সাইফুল আমীন।

জানতে চাইলে অধ্যাপক সাইফুল আমীন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এখানে প্রচুর সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো ব্রিজ ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড নেই। আসলে এজন্য সরকারি কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। সওজ ও এলইজিইডি সেতু নির্মাণে নিজস্ব ব্রিজ ডিজাইন ম্যানুয়াল অনুসরণ করে। তবে এগুলোতে স্পষ্টই লেখা রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের কথা। ফলে যে দেশের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেতুর ডিজাইন করে, সে ওই দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিজস্ব কোনো ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড না থাকায় বড় বড় সেতু নির্মাণে সমস্যা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম পদ্মা সেতু। এটি নির্মাণের সময় ২২টি পিলারের নকশায় জটিলতা দেখা দেয়। পিলারগুলোর জন্য পানির জিরো ডিগ্রি থেকে ১১০ থেকে ১২০ মিটার গভীর পাইল করতে হয়েছে। তবে পাইলিং করতে গিয়ে এর তলদেশে কাদার স্তর ধরা পড়ে। ফলে এসব পাইলের জন্য স্ক্রিং গ্রাউটিং (খাজ কাটা) পাইল করতে হয়েছে। এছাড়া ২২টি পিলারের একটি পাইল বেশি নির্মাণ করতে হয়েছে। পাশাপাশি পাইলের শেষ প্রান্তে কেমিক্যাল দিয়ে মাটির গুণগত মান পরিবর্তন করতে হয়েছে।

এদিকে নদীর তলদেশে কাদার স্তর থাকায় রূপসা রেল সেতু নির্মাণেও জটিলতা দেখা দেয়। এটির খুলনা প্রান্তে বারবার পাইল ফেইল করে। পরবর্তী সময়ে পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন পাইলের পয়েন্টে মাটির অবস্থা খুবই খারাপ। এটি এতটাই খারাপ যে, ডিজাইন লোড বহন করা খুবই কঠিন। এজন্য পরে পাইলের নিচে বেইস গ্রাউটিং করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পাইলের শেষ প্রান্তে মাটি কেমিক্যালের সাহায্যে বিশেষ ধরনের ট্রিটমেন্ট করা হয়।

এদিকে নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ড না থাকায় প্রথম মেঘনা সেতুটির ভূমিকম্প সহনীয় মাত্রা অনেক কম। বুয়েটের এক গবেষণায় দেখানো হয়, বিল্ডিং কোডে ভূমিকম্প সহনীয় কোফিসিয়েন্ট দশমিক ১৫। অথচ মেঘনা সেতুতে ভূমিকম্প সহনীয় কোফিসিয়েন্ট দশমিক শূন্য পাঁচ তথা ৩ ভাগের ১ ভাগ। বিল্ডিং কোড প্রণয়নের আগে সেতুটি নির্মাণ করায় এ ত্রুটি রয়ে গিয়েছিল।

এদিকে নকশা ভুলের কারণে যমুনা সেতুতেও ফাটল দেখা দিয়েছিল। এ-সংক্রান্ত বুয়েটের একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর নকশা প্রণয়নে ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড (বিএস) ৫৪০০ অনুসরণ করা হয়। সেতু নির্মাণে ১৯৭৮ সালে প্রণীত এ ম্যানুয়াল অনুযায়ী, বাতাসে তাপমাত্রা ২৪ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে সেতুর উপরিকাঠামোর (সুপার স্ট্রাকচার) তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৩৭ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করবে। এরূপ বিবেচনায় নকশা প্রণয়ন করা হয় যমুনা সেতুর, প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে যার কোনো মিল নেই।

বুয়েটের গবেষণায় দেখা যায়, বাস্তবে গ্রীষ্মকালে সেতুটির সুপার স্ট্রাকচারের তাপমাত্রা ১৯ থেকে ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠানামা করে। আর শীতে এ তাপমাত্রা ১৩ থেকে ৩২ ডিগ্রির মধ্যে থাকে। আবার গ্রীষ্মে হঠাৎ শিলাবৃষ্টি হলে ঘণ্টার ব্যবধানেই তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়। তাপমাত্রার এ ধরনের পার্থক্য সেতুটির নকশা প্রণয়নের সময় বিবেচনা করা হয়নি। এতে সেতুটির ডেক স্ল্যাবে ব্যবহৃত রডের সংকোচন ও প্রসারণ ব্যাহত হয়। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই সেতুতে ফাটল দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে এসব ফাটল ক্রমে বড় হয়েছে ও সংখ্যায় বেড়েছে। এছাড়া অত্যাধিক তাপমাত্রার কারণে সেতুটির মেরামত কাজও একাধিকবার ব্যাহত হয়।

জানতে চাইলে গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য বুয়েটের অধ্যাপক ড. সাইফুল আমীন বলেন, ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড হুবহু বাংলাদেশে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। কারণ বাতাস, তাপমাত্রা, আদ্রতাসহ পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের ভিন্নতা রয়েছে। ফলে বঙ্গবন্ধু সেতুর নকশায় কিছুটা ত্রুটি ছিল। তবে ফাটল মেরামতের সময় প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এদিকে নতুন করে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওযা হয়েছে। তাই নতুন বড় সেতু নির্মাণের আগে সঠিক ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Source - Jatiyo Arthoniti

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow