রাজশাহী সিটি নির্বাচন ঘিরে সরব সম্ভাব্য প্রার্থীরা

Aug 24, 2026 - 11:20
 0  4
রাজশাহী সিটি নির্বাচন ঘিরে সরব সম্ভাব্য প্রার্থীরা

রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনও এখন পর্যন্ত কোনো তফসিল ঘোষণা করেনি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় এরই মধ্যে নগরজুড়ে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে নিজেদের প্রার্থী নির্ধারণ করে মাঠপর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা অর্ধডজনের বেশি। সম্ভাব্য প্রার্থীরা বলছেন, দল যাকেই মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন তারা।

গত সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর কাছে ২৮ হাজার ১৭৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর এবার রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হচ্ছেন। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে কাজ শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের প্রচার ও সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের নেতারা বলছেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তারা ভিন্ন কৌশলে নির্বাচনী মাঠে নামবেন।

রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো নেতা বা সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে না থাকলে তাদের ভোটের একটি অংশ জামায়াতের পক্ষে যেতে পারে। গত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশের ভোট পেয়েছিল বলে দলটির নেতারা মনে করেন। তবে আওয়ামী লীগের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকলে সেই পরিস্থিতি বিএনপির জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মেয়র ও দলের কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বর্তমান রাসিক প্রশাসক ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন, নগর বিএনপির সহসভাপতি এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শহীন শওকত, নগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন, জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সমাপ্ত এবং নগর যুবদলের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবি।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের রাজনীতিতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের দীর্ঘদিনের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের কাছে পরাজিত হন তিনি। এরপর ২০১৩ সালের নির্বাচনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন বুলবুল। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আবারও খায়রুজ্জামান লিটনের কাছে পরাজিত হন তিনি। এসব নির্বাচনী অভিজ্ঞতার কারণে বিএনপির একটি অংশ মনে করে, আসন্ন সিটি নির্বাচনে বুলবুল অন্যতম শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী।

তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর বুলবুলকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তাকে বাংলাদেশ বন ও শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।

নিজের প্রার্থিতার বিষয়ে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা না করা পর্যন্ত নির্বাচনী কার্যক্রমের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বিএনপিতে পাঁচ থেকে সাতজন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে বলে জানান তিনি।

নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনও দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থার কথা জানিয়েছেন। ছাত্রদল ও যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে নগর বিএনপির নেতৃত্বে আসা রিটন বলেন, দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই তার সিদ্ধান্ত। দলের জন্য এবং নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় প্রস্তুত রয়েছেন।

নগর বিএনপির সহসভাপতি ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদও মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। তার দাবি, রাজশাহী সদর আসন ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। গত সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে একটি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে ভোট বাড়িয়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন। দল তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিজয়ী হতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হলে দলকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শহীন শওকতও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকেই তাকে সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন। তবে দল শেষ পর্যন্ত যাকেই মনোনয়ন দেবে, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে তার পক্ষে কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

ভিন্ন কৌশলে মাঠে জামায়াত

রাজশাহী সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ১১ আগস্ট দলীয় ফোরামে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি জানান, দলীয় পর্যায়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে এবং আপাতত তারা সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

জাহাঙ্গীর বলেন, গত সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী সদর আসনে অল্প ব্যবধানে তারা পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে জোটগত রাজনীতির কারণে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর পক্ষে জামায়াতের নেতাকর্মীরা কাজ করেছেন। এবার নিজেদের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে অতীতের কিছু ভুল ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা সংশোধন করে মাঠে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সবার আগে প্রার্থী ঘোষণা এনসিপির

রাজশাহী সিটি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আগে নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত মার্চে দলটির রাজশাহী মহানগর শাখার আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে বাছাই করা হয়।

মোবাশ্বের আলী জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠকও করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার আগেই এসব কার্যক্রম নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ রয়েছে বলে তিনি জানেন না।

সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষণা না হলেও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী, জামায়াতের ঘোষিত প্রার্থী এবং এনসিপির প্রার্থীকে ঘিরে আগামী দিনে নগরীর রাজনৈতিক মাঠ আরও সরগরম হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত কারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং কোন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ও দলগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow