ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আস্থার সংকট, গ্রাহকের ঝুঁকছেন সাধারণ ব্যাংকে

Aug 20, 2026 - 11:26
 0  3
ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আস্থার সংকট, গ্রাহকের ঝুঁকছেন সাধারণ ব্যাংকে

শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং থেকে মুখ ফিরিয়ে সাধারণ ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছেন অনেক গ্রাহক। সাম্প্রতিক আমানত ও রেমিট্যান্স প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণে এমন প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে কর্মীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আমানত ও প্রবাসী আয়—দুই ক্ষেত্রেই ইসলামী ব্যাংকিং খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। এতে খাতটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কমেছে ইসলামী ব্যাংকের আমানত

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন মাসের ইসলামী ব্যাংকিংসংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের তুলনায় জুনে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। মে মাসে এসব ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে তা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকায়।

শুধু সাধারণ শাখার আমানত নয়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর এজেন্ট ব্যাংকিংয়েও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। জুনে আগের মাসের তুলনায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত কমেছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফসিগুলোর আমানতও মাসিক ভিত্তিতে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে একই সময়ে সাধারণ বা কনভেনশনাল ব্যাংকগুলোর আমানত প্রায় ৩ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে। ফলে একদিকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আমানত কমছে, অন্যদিকে সাধারণ ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়ছে—যা গ্রাহকদের ব্যাংক নির্বাচনের প্রবণতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রেমিট্যান্সেও পিছিয়ে পড়ছে ইসলামী ব্যাংক

আমানতের পাশাপাশি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আহরণেও ইসলামী ব্যাংকিং খাত চাপের মুখে পড়েছে। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মে মাসে এর পরিমাণ ছিল ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে প্রায় ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ।

শুধু মাসিক হিসাবেই নয়, গত বছরের জুনের তুলনাতেও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স কমেছে ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এতে দেশের রেমিট্যান্স বাজারে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ঐতিহ্যগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে গ্রাহকদের আস্থা কমেছে। এর ফলে অনেক আমানতকারী সাধারণ ব্যাংককে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক মনে করছেন। এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে আমানত স্থানান্তরের প্রবণতাও এ কারণেই বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রবাসীরা ইসলামী ব্যাংকের পরিবর্তে কনভেনশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর দিকে বেশি ঝুঁকছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স ব্যবসায়ও চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের রেমিট্যান্স প্রবাহে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিরও কিছু প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে ওই অঞ্চলে কর্মরত প্রবাসীদের আয় পাঠানোর ধরন ও প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক বছরে কমেছে ৩ হাজার ৪৮৪ কর্মী

ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু আমানত ও রেমিট্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট কর্মী ছিল ৪৮ হাজার ৭০৯ জন। এক বছর পর, ২০২৬ সালের জুনে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২২৫ জনে।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে কর্মী কমেছে ৩ হাজার ৪৮৪ জন। শতাংশের হিসাবে এ হ্রাস ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে জনবল কমার হার আরও বেশি। এসব ব্যাংকে এক বছরে কর্মী কমেছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোতেই জনবল সংকোচনের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিংসেবায় ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের ফলে অনেক ম্যানুয়াল ও প্রশাসনিক কাজের জন্য আগের তুলনায় কম কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেও জনবল কমার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমানত কমে যাওয়া, রেমিট্যান্স প্রবাহে পতন এবং কর্মীসংখ্যা হ্রাস—সব মিলিয়ে খাতটির ওপর চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ ও বিশেষ তদারকির মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু তারল্য সহায়তা বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সংকট কাটানো কঠিন।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী নজরদারি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বৈদেশিক লেনদেন নিষ্পত্তির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

বাজার ধরে রাখতে প্রয়োজন দ্রুত সংস্কার

দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকিং দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমানত সংগ্রহ ও রেমিট্যান্স আহরণে এই খাতের কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থানও দীর্ঘদিন শক্তিশালী ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমানত, রেমিট্যান্স ও কর্মসংস্থানের নিম্নমুখী প্রবণতা খাতটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে মে ও জুনের তথ্য থেকে ইসলামী ব্যাংকের তুলনায় সাধারণ ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি শুধু সাময়িক তারল্য সংকট নয়, বরং আস্থার প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত।

তাই ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া না হলে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ও রেমিট্যান্সের বাজার অংশীদারত্ব আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow