বাংলা কিউআর লেনদেনে বড় উল্লম্ফন, মার্চেন্ট ছাড়াল ৩০ লাখ
দেশে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। মার্চেন্টদের কাছ থেকে ন্যূনতম ১ শতাংশ চার্জ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পর এ ব্যবস্থায় যুক্ত মার্চেন্ট ও লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে বাংলা কিউআরে যুক্ত মার্চেন্টের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে দৈনিক গড় লেনদেনও গত সপ্তাহে ১১০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যেখানে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রথম মাস জুলাইয়ে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৪০ কোটি টাকার কিছু বেশি।
ক্যাশলেস লেনদেনকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ১০ আগস্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়। একটি নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্চেন্টদের কাছ থেকে ন্যূনতম ১ শতাংশ চার্জ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্য নির্দেশনায় লেনদেনের খরচ কমাতে প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রাথমিকভাবে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি লেনদেনে একুয়্যারিং প্রতিষ্ঠান প্রতি ১০০ টাকায় ১০ পয়সা এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ২০ পয়সা হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ভর্তুকি পাবে। এই ব্যবস্থা আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে বাংলা কিউআর ব্যবস্থা চালু করে। তবে এতদিন এটি বাধ্যতামূলক ছিল না। ‘এক দেশ এক কিউআর’ নীতির আওতায় গত ১ জুলাই থেকে দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও মোবাইল ওয়ালেটের কোডভিত্তিক লেনদেন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করা বাধ্যতামূলক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানো, নগদ অর্থ ও ছাপানো নোটের ব্যবহার কমানো এবং দ্রুত ও কম খরচে ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা। একই কিউআর ব্যবস্থার কারণে এখন কোনো দোকান বা বিল সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানে একটি ব্যাংক বা এমএফএসের বাংলা কিউআর থাকলেই বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহক সেখানে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন। ফলে ব্যবসায়ীদের একাধিক প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর কোড রাখার প্রয়োজন হচ্ছে না।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে মাস শেষে একুয়্যারিং প্রতিষ্ঠান লেনদেনের ০.১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় হলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতে টাকা ছাপানোর প্রয়োজনীয়তাও কমতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে লেনদেন
বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআরের সঙ্গে যুক্ত মার্চেন্টের সংখ্যা এবং লেনদেনের পরিমাণ নিয়মিত সাপ্তাহিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি সপ্তাহেই এই ব্যবস্থায় লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে।
সর্বশেষ ১৬ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে মোট ৭৭৩ কোটি টাকা পরিশোধ হয়েছে। এ সময়ে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর আগের সপ্তাহ, অর্থাৎ ৯ থেকে ১৫ আগস্ট দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৯৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২ থেকে ৮ আগস্ট দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৭০ কোটি টাকার কিছু কম।
বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। সে সময় দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর আগের মাস জুনে লেনদেন হয়েছিল ৮৪৫ কোটি টাকা। মে মাসে ৪৭৯ কোটি, এপ্রিলে ১৯৯ কোটি, মার্চে ২২৯ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২১৮ কোটি এবং জানুয়ারিতে ২১২ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। অর্থাৎ মাসের হিসাবে বাংলা কিউআরের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
২১ দিনে নতুন মার্চেন্ট ছয় লাখের বেশি
বাংলা কিউআরে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৪২টিতে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশে বাংলা কিউআরের মোট মার্চেন্ট সংখ্যা এখন ৩০ লাখ ৩১ হাজার ৯০৮টি।
এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট সংখ্যা ১৮ লাখ ৭৪ হাজার, যা মোট মার্চেন্টের ৬১ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত ১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলা কিউআরে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৭টি এবং মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৩৩টি। অর্থাৎ চলতি মাসের মাত্র ২১ দিনে নতুন করে ৬ লাখ ৬ হাজার ৭৭৫টি মার্চেন্ট যুক্ত হয়েছে। দৈনিক হিসাবে গড়ে প্রায় ২৯ হাজার নতুন মার্চেন্ট এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।
মার্চেন্ট সংখ্যার দিক থেকে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে বিকাশ। ২২ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩ হাজার ৪৫৪টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, যার মার্চেন্ট সংখ্যা ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৬২৮টি। ইসলামী ব্যাংকের মার্চেন্ট সংখ্যা ২ লাখ ৬৩ হাজার ২২টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
এ তালিকায় সোনালী ব্যাংকের মার্চেন্ট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৫৫৩টি। পঞ্চম অবস্থানে থাকা টালিপের মার্চেন্ট সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার ৩৫৮টি। এরপর রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমএফএস সেবা রকেট, যার মার্চেন্ট সংখ্যা ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৮০টি।
শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, যার মার্চেন্ট সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৫০টি; সেবা ফিনটেকের ১ লাখ ১৯ হাজার; মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১ লাখ ১১ হাজার ৩৫০ এবং রূপালী ব্যাংকের ৯৭ হাজার ২৫৩টি মার্চেন্ট।
বাংলা কিউআরের মার্চেন্ট ও লেনদেনের এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চার্জ কমানো, প্রণোদনা এবং ‘এক দেশ এক কিউআর’ নীতির কারণে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত ডিজিটাল লেনদেনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে একটি আরও সমন্বিত ও ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
What's Your Reaction?