শক্তিশালী তারল্য, তবু গভীর আর্থিক সংকটে অগ্রণী ব্যাংক

Aug 24, 2026 - 11:07
 0  5
শক্তিশালী তারল্য, তবু গভীর আর্থিক সংকটে অগ্রণী ব্যাংক

শক্তিশালী তারল্য ও বড় আমানতভিত্তি থাকার পরও গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪০ দশমিক ১২ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি হয়েছে ৮ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশে। বিপরীতে তারল্য কভারেজ অনুপাত ছিল ৩৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ অগ্রণী ব্যাংকের মূল সমস্যা তারল্য সংকট নয়; বরং ঋণের মান, প্রভিশন এবং মূলধন পর্যাপ্ততার দুর্বলতা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদন ও বিভিন্ন তথ্য থেকে ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থার এই চিত্র উঠে এসেছে। সভায় ২০২৫ সালে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় যে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, তা কতটা টেকসই ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কারণ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণের হার আবার ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে পরিচালন মুনাফাও।

২০২৫ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল। ওই বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়ে ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালের জুন শেষে পরিচালন মুনাফা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ কোটি টাকায়। ফলে গত বছরের তুলনায় ব্যাংকের আয় ও আর্থিক সক্ষমতার স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মূলধন ও প্রভিশনে বড় ঘাটতি

২০২৬ সালের জুন শেষে অগ্রণী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক মূলধন ছিল ১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। অথচ ন্যূনতম প্রয়োজন ছিল ৯ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রথম স্তরের মূলধনও কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকায়।

ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২০২৫ সালের ১২ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা থেকে কিছুটা কমে ২০২৬ সালের জুনে ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে প্রভিশন কভারেজ অনুপাত মাত্র ২১ শতাংশ। বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যাপ্ত প্রভিশন না থাকলে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফাকে প্রকৃত আর্থিক শক্তির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।

অগ্রণী ব্যাংক ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু জুন শেষে খেলাপি ঋণ যেখানে ৪০ দশমিক ১২ শতাংশ, সেখানে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যাংককে নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি ঠেকানোর পাশাপাশি পুরোনো বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়েও জোর দিতে হবে।

ঋণ আদায়েও বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৫ সালে ব্যাংকটি মোট ১০ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা ঋণ আদায়ের কথা জানিয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রকৃত নগদ আদায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৯ কোটি টাকা। বাকি অংশ পুনঃতফসিল, সমন্বয় কিংবা অন্যান্য অ-নগদ উপাদানের মাধ্যমে হিসাব করা হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে প্রকৃত নগদ আদায়ের পরিমাণ কত, তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে অর্থঋণ আদালত-সংক্রান্ত ৪ হাজার ২২৫টি মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ১৪ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। রিটসহ মোট ৪ হাজার ৫৪৯টি মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ১৪ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি রাইট-অফ করা ৫ হাজার ৬২৫ কোটি টাকার ঋণ থেকেও আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তারল্য শক্তিশালী হলেও ঝুঁকি অন্য জায়গায়

অগ্রণী ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকের তারল্য কভারেজ অনুপাত ছিল ৩৪৪ শতাংশ এবং নিট স্থিতিশীল তহবিল অনুপাত ছিল ১২৭ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকের হোলসেল অন-লোনিং বা এইচওএলএ ছিল প্রায় ৪৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ক্যামেলস রেটিংয়েও ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিকে ‘সন্তোষজনক’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।

জুন শেষে ব্যাংকের আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৩ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ১৫ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। তবে এসব ইতিবাচক সূচকের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৮ হাজার ৮৬ কোটি টাকা।

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেও উদ্বেগ

অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও অডিট ব্যবস্থাপনাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকটির অনিষ্পন্ন অডিট ল্যাপসের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৪৮টি। এর মধ্যে গুরুতর ল্যাপস ছিল ৪৫২টি এবং মেজর ল্যাপস ছিল ৩৯ হাজার ৫৯৩টি। মোট ল্যাপস সমাধানের হার মাত্র ৪ শতাংশ হওয়ায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সংকট কাটাতে পাঁচ অগ্রাধিকার

অগ্রণী ব্যাংকের আর্থিক সংকট কাটাতে সম্পদের মান পুনরুদ্ধার, প্রভিশন ও মূলধন পুনরুদ্ধার, টেকসই মুনাফা অর্জন, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়ন—এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো ও রাইট-অফ করা ঋণ আদায়, নতুন খেলাপি ঋণ ঠেকানো, প্রভিশন ঘাটতি পূরণ, অভ্যন্তরীণভাবে মূলধন বাড়ানো, কম খরচের আমানত বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ বিতরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শক্তিশালী তারল্য পরিস্থিতি এবং বড় আমানতভিত্তি অগ্রণী ব্যাংককে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে খেলাপি ঋণ কমানো, বিপুল মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি পূরণ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে শুধু তারল্য বা সাময়িক পরিচালন মুনাফার ওপর ভর করে ব্যাংকটির আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। ব্যাংকটির টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঋণের মান উন্নয়ন, কার্যকর আদায় ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিত করা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow