বাড়ন্ত পাল, সংকুচিত বন: আশঙ্কায় ময়মনসিংহের হাতি ও সীমান্তবাসী

Jul 26, 2026 - 11:22
 0  7
বাড়ন্ত পাল, সংকুচিত বন: আশঙ্কায় ময়মনসিংহের হাতি ও সীমান্তবাসী

ময়মনসিংহ অঞ্চলে হাতির সংখ্যা বাড়লেও বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া, ঐতিহ্যবাহী পরিযায়ন পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মানব-হাতি দ্বন্দ্ব বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উত্তরসীমান্তের অন্যতম শেষ আন্তঃসীমান্ত হাতির পাল এখন চরম হুমকির মুখে।

শোরপুরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্যপ্রাণী রেঞ্জার মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল আমিনের মতে, গত ছয় বছরে এই অঞ্চলে প্রায় ৪০টি হাতির বাচ্চার জন্ম রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে উত্তরাঞ্চলে হাতির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৪০-এ পৌঁছেছে। চলতি প্রজনন মৌসুমেই প্রায় ১৫টি ছানার জন্ম রেকর্ড করা হয়েছে।

সংকুচিত হচ্ছে বনভূমি হাতির সংখ্যা বাড়লেও এদের চলাচলের জায়গা দ্রুত কমে আসছে। ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজি মোহাম্মদ নুরুল করিম জানান, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনা জুড়ে বিস্তৃত ৭১,০০০ একরের বেশি বনাঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ (প্রায় ২৯,৭০৩ একর) অবৈধ দখল, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দিনে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি খাবার এবং ১৫০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। বনের আয়তন কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা খাবারের খোঁজে লোকালয় ও ফসলের মাঠে হানা দিচ্ছে।

সীমান্তের কাঁটাতার ও দ্বন্দ্বে প্রাণহানি বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে দ্বন্দ্বে ৭৮ জন মানুষ এবং ১৯টি হাতি মারা যায়। আর ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক স্পৃষ্ট হয়ে ও অন্যান্য কারণে অন্ততঃ ৩৫টি হাতি মারা গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজ ও অধ্যাপক এম এ আজিজ জানান, ২০০৭ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের তৈরি ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে হাতিগুলো মেঘালয়ের পাহাড় থেকে শুধু ধান কাটার মৌসুমে বাংলাদেশে আসত এবং মাস দুয়েক থেকে ফিরে যেত। কিন্তু এখন কাঁটাতার ও সীমান্তের গেটগুলো বন্ধ রাখার কারণে হাতিগুলো আর ভারতে ফিরতে পারছে না এবং সারাবছর বাংলাদেশের অংশেই আটকা পড়ে থাকছে। এতে শেরপুরের ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালীতাবাড়ী এবং জামালপুরের বকশীগঞ্জে মানুষ ও হাতির সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।

হয়রানি ও সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, হাতিগুলো সাধারণত শান্ত স্বভাবের হলেও ককটেল বিস্ফোরণ, শটগানের ফায়ার, আগুন বা বিদ্যুৎ দেওয়া হলে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সভাপতি সুজয় মালাকার জানান, ইদানিং অনেক সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিডিও তৈরির জন্য হাতিগুলোকে ধাওয়া করে চরম বিরক্ত করছে, যা তাদের আরও সহিংস করে তুলছে।

উত্তরণের উপায় ও উদ্যোগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগ আন্তর্জাতিক সংস্থা IUCN-এর সহায়তায় ২০১৮ সাল থেকে শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনার প্রায় ৭০০ একর অবক্ষয়িত বনভূমিতে বহেড়া, আমলকী, হরীতকী, শিমুল ও কাঁঠালের মতো দেশীয় প্রজাতির ফলের গাছ রোপণ শুরু করেছে।

এছাড়া লোকালয়ে হাতি আসা রোধে এবং মানুষকে সতর্ক করতে ৫৩০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ৫৩টি 'এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম' (ERT) গঠন করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে হাতির প্রাচীন পরিযায়ন করিডোর বা পথগুলো পুনরায় খুলে দিতে হবে এবং বনাঞ্চল রক্ষা করতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow