সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড
সিরিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সাবেক প্রধান আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দামেস্কের একটি ফৌজদারি আদালত। দেশটির গৃহযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও নিপীড়নের বিচার প্রক্রিয়ায় এই রায়কে দেশটির ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০১১ সালে সিরিয়ার দারা প্রদেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে বাশার আল-আসাদ সরকারের সংঘটিত দমন-পীড়ন ও নৃশংসতা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় স্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ। সেই ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে বাশার আল-আসাদকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আতেফ নাজিবকে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে বাশার আল-আসাদ বর্তমানে রাশিয়ায় নির্বাসিত থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই এ বিচার সম্পন্ন হয়।
সিরিয়ায় হাফিজ আল-আসাদের হাত ধরে শুরু হওয়া পরিবারের ৫৩ বছরের শাসনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। বাবার মৃত্যুর পর ২০০০ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করা বাশার আল-আসাদ শুরুতে কিছু সংস্কারের ইঙ্গিত দিলেও পরবর্তীতে বাবার মতোই এক চরম কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত হন। ২০১১ সালের মার্চে আরব বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় পৌঁছালে তিনি কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভ দমনের পথ বেছে নেন, যার ফলে দেশটিতে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। তেরো বছরের এই যুদ্ধে ছয় লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং বাস্তুচ্যুত হন এক কোটি ত্রিশ লাখের বেশি নাগরিক।
গৃহযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে রাশিয়া, ইরান এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে বাশার আল-আসাদ এক দশকেরও বেশি সময় টিকে থাকতে সক্ষম হন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং মিত্রদের সামরিক অগ্রাধিকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের শেষ দিকে তাঁর ক্ষমতার ভিত পুরোপুরি নড়বড়ে হয়ে যায়। বিদ্রোহী জোট হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতৃত্বে দুর্বার অভিযানের মুখে একে একে আলেপ্পো, হামা এবং হোমসের মতো কৌশলগত শহরগুলোর পতন ঘটে।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ভোরে বিদ্রোহীদের দামেস্ক দখলের মুখে বাশার আল-আসাদ একটি বিশেষ বিমানে করে দেশ ছেড়ে মস্কোয় আশ্রয় নেন। এর মাধ্যমে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর রক্তক্ষয়ী আধিপত্যের অবসান ঘটে এবং দেশটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। ক্ষমতাচ্যুতির প্রায় পৌনে দুই বছর পর আদালতের এই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শিকার লাখ লাখ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের একটি প্রতীকী স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
What's Your Reaction?