প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কাটিয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের জোর দাবি
গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আমলাতন্ত্র এবং সরকারের অনুগৃহীত সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীদের অশুভ আঁতাত (নেক্সাস) দেশের অর্থবহ উন্নয়ন ও নীতিমালা প্রণয়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘উন্নয়ন কৌশল ও নীতিগত স্বাধীনতা: বাংলাদেশের উন্নয়ন পথপরিক্রমা’ শীর্ষক এক সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তাঁদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন দুর্বল খাত পুনর্গঠনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হলেও কেবল এই বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিংবা ব্যাংক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কাঙ্ক্ষিত গতিতে সংস্কার করা যাচ্ছে না।
আঁতাত ও সংস্কারের বাধা: সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ও সানেমের ড. সেলিম রায়হান উল্লেখ করেন যে, দেশে নীতিগত স্বাধীনতা বিঘ্নিত হওয়ার পেছনে কেবল বাইরের চাপ নয়, ভেতরের স্বার্থান্বেষী দলগুলোও দায়ী। রাজস্ব ব্যবস্থা বা ব্যাংকিং খাতে কোনো সংস্কার উদ্যোগ নিলে আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী চক্র নিজেদের সুবিধাবাদী অবস্থান ধরে রাখতে তা প্রতিহত করে। দেশের সার্বিক জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে এই চক্র ভেঙে ফেলা ছাড়া বিকল্প নেই।
বিদেশি ঋণের বোঝা ও ঝুঁকি: সেমিনারে মেট্রো চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান ও ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ এখন বিদেশি সাহায্যের চেয়ে উচ্চসুদের ঋণের ওপর বেশি নির্ভর হয়ে পড়ছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য নেওয়া এই ঋণ ভবিষ্যতে বড় অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেকারত্ব দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
নীতিগত স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ: প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে বেসরকারীকরণ, পোশাক খাতের বিকাশ ও কৃষি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি হলেও সময়ের সাথে সাথে বহিঃস্থ চাপ ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিতে বাংলাদেশের নীতিগত স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমান শর্তে টিকতে হলে এবং দর কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হলে অভ্যন্তরীণ সুশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত করা এবং শক্তিশালী সামাজিক পুঁজি গড়ে তোলা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ: টেকসই ও স্বাধীন অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে সরকার নির্ধারিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন, বিচক্ষণ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের পূর্ণ সংস্কার, প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃচ্ছ্রসাধন এবং কম খরচে অর্থায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়।
What's Your Reaction?