ফ্রান্সে ফের বিক্ষোভ-সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১ হাজার ৩০০-এর বেশি

Oct 26, 2026 - 12:04
 0  8
ফ্রান্সে ফের বিক্ষোভ-সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১ হাজার ৩০০-এর বেশি

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার প্রতিবাদে আবারও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। গত শনিবার দেশজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দিনের বেশির ভাগ সময় পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও রাতে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সের অধিকাংশ এলাকায় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মার্সেইয়ের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া হয়। বোর্দোতে একটি দোকানের কাঠের পাটাতন খুলে নিয়ে যান বিক্ষোভকারীরা। তবে গত সপ্তাহের মতো ব্যাপক দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা এবার অনেকাংশে এড়াতে সক্ষম হন কর্মকর্তারা। গত সপ্তাহের সহিংসতায় আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। গত সপ্তাহের মতো পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি শহরে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্কুলের প্রতিকূল পরিবেশ এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার প্রতিবাদে এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

গত সপ্তাহের বিক্ষোভে পুলিশের তুলনায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা বেশি থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সে সময় শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয় এবং বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত সপ্তাহের শুরুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ কেবল স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভের অনুমোদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। এদিকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে শত শত মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শনিবার প্যারিসের পোর্ত দ্য ইতালি এলাকা থেকে পোর্ত দ্য ভঁসেন পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার শেষ পর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশি অভিযানে সাধারণ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনীর পাশাপাশি অপরাধী চক্র ও সন্ত্রাসবাদ দমনে কাজ করা একটি বিশেষ অভিজাত ইউনিটও অংশ নেয়। কয়েকজন বিক্ষোভকারী অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। এ ছাড়া একটি গাড়ির শোরুমের জানালা ভাঙচুরের পর মুখোশ পরা একদল তরুণকে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজের বরাতে বলা হয়, পদযাত্রার পেছনের অংশে কয়েক হাজার উগ্রপন্থি কর্মী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে দাঙ্গাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মার্সেইয়েও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সেখানে আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া হয় এবং ধাতব পাত ব্যবহার করে রাস্তা অবরোধ করা হয়। ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়িকে জ্বলন্ত ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে চলতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, লিয়োঁ শহরে স্থানীয় প্রশাসনের নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি এলাকায় জড়ো হওয়া জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড ব্যবহার করে। ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরের এক বিক্ষোভকারী জানান, সেখানে উপস্থিত প্রায় ১৫০ জনের বেশির ভাগই ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর রাস্তায় দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে বলে জানান তিনি।

দিনের শেষভাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনিয়েজ জানান, বিক্ষোভে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের একজন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরে এবং অন্যজন মধ্য ফ্রান্সের ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরে আহত হন।

প্যারিসে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জেলি নামের এক নারী বিবিসিকে বলেন, ‘ভীষণ হতাশা’ থেকেই মানুষ রাস্তায় নেমেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাখোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মানুষ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুখোশ পরা দুই কিশোর বিক্ষোভকারীও নিজেদের প্রজন্মের হতাশার কথা জানান। তাঁদের মতে, সরকার তাঁদের প্রজন্মকে পরিত্যাগ করেছে।

শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরেক ব্যক্তি বলেন, লুটপাট কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে এর পেছনে দারিদ্র্য ও পুলিশের সহিংসতার মতো বিষয় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের দাবির জবাব পাওয়া গেলেই বিক্ষোভ শেষ হবে। আমরা সত্যিই ফ্রান্সে পরিবর্তন চাই।’

এদিকে মধ্য-উত্তরাঞ্চলীয় অর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি নাসিওনাল র‍্যালি দলের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ অংশ নেন। সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।

ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরেও শনিবার বিক্ষোভ ও অস্থিরতা দেখা দেয়। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী হাজারো বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। উত্তর ইতালির মিলানে বিক্ষোভ ঘিরে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি শত শত সেনাসদস্য মোতায়েন করে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়।

গত সপ্তাহের শেষভাগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর জনঅসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুতে অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে সহিংসতা, লুটপাট ও ভাঙচুর ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিআই) তথ্যমতে, দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত পুলিশের একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে রাতভর কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয় ফরাসি কর্তৃপক্ষ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow