সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘নবম জাতীয় পে স্কেল ২০২৬’ জারির প্রজ্ঞাপন

Sep 20, 2026 - 12:47
 0  5
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘নবম জাতীয় পে স্কেল ২০২৬’ জারির প্রজ্ঞাপন

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এতে বলা হয়, নতুন পে স্কেল গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। বকেয়া অর্থ চলতি সেপ্টেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গেই পাবেন তারা। 

নতুন কাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম পে স্কেল অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এতে সর্বোচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। আর নিচের গ্রেডের মূল বেতন বেড়েছে রেকর্ড ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। 

গতকাল শনিবার চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ নামে প্রজ্ঞাপনটি অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতনের ৫০ শতাংশ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আপাতত চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা এই হারে বেতন পাবেন। 

১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে জুন পর্যন্ত বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ (১ম থেকে নবম গ্রেড) এবং ৭৫ শতাংশ (১০ম থেকে ২০তম গ্রেড) কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির বাকি শতভাগ কার্যকর হবে। সেই সময় থেকে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিও কার্যকর হবে।

এদিকে, অন্যান্য সব ভাতা ২০২৬ সালের ৩০ জুনে যে হারে দেওয়া হয়েছে, সেই হারেই ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হবে। নতুন প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত ভাতার হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। 

এর আগে সর্বশেষ জাতীয় পে স্কেল চালু হয়েছিল ২০১৫ সালে। তখন সেটাই ছিল সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধির ঘটনা। ওই পে স্কেলে সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন ৯৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে ১০১ শতাংশ বেড়েছিল।

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ক্ষমতাবলে জারি করা আদেশে বেতন নির্ধারণ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, পেনশন, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, টিফিনসহ বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধার নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাসিক পেনশন সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০, সর্বনিম্ন ১৮ হাজার টাকা
বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ের যারা ৯ হাজার টাকা পেনশন পান, তারা এখন পাবেন ১৮ হাজার টাকা। আর বর্তমানে সর্বোচ্চ যারা মাসে ৪০ হাজার এক টাকা থেকে এর বেশি পেনশন পান, তারা পাবেন ৭০ হাজার ২০০ টাকা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসে ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন গ্রহণকারীদের পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার এক টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার এক টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার এক টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ আর ৪০ হাজার এক টাকা বা এর বেশি নিট পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বাড়বে ৫৫ শতাংশ।

গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন পদ্ধতি চালুর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এই পদ্ধতি চালু করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে। সেই সঙ্গে বেসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগের অবসর গ্রহণকারীদের তথ্য না থাকায় এ পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

বাড়ি ভাড়া পাবেন তিনভাবে
এলাকা ও গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়ার হারও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চাকরি করা গ্রেড ২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড ১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন। গ্রেড ১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড ১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৫০ শতাংশ। গ্রেড ৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড ৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪৫ শতাংশ। আর গ্রেড ৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকার জন্য বাড়ি ভাড়ার হার কিছুটা কম। এসব এলাকায় গ্রেড ২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড ১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন। 

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা
নতুন বেতন কাঠামোয় গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১ থেকে ১১ নম্বর গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গ্রেড ১২ থেকে ২০ পর্যন্ত বাড়ানোর হার ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার পদে বেতন হবে এক লাখ ৭২ হাজার টাকা। এতদিন তাদের মূল বেতন ছিল ৮৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ সচিব ও সমমর্যাদার পদের বেতন হবে এক লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এতদিন পেতেন ৮২ হাজার টাকা।

অন্যদিকে গ্রেড ১-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা; এবং গ্রেড ২০-এ আট হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

চিকিৎসা ভাতা ৬ হাজার টাকা
চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও নতুন বিধান করা হয়েছে। কর্মরত চাকরিজীবীদের জন্য ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মাসিক তিন হাজার টাকা এবং ৫০ বছর পার হলে মাসিক চার হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার বিধান রাখা হয়েছে। পেনশনভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্য বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতার পরিমাণ আরও বেশি। ৫০ বছর পর্যন্ত তিন হাজার, ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত চার হাজার, ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত পাঁচ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে মাসিক ছয় হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলা নববর্ষ ভাতা ১৫ শতাংশ
সব কর্মচারী আহরিত মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা পাবেন। মাসিক নিট পেনশন গ্রহণকারী অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও মূল পেনশনের ভিত্তিতে এ সুবিধা পাবেন।

শিক্ষা সহায়তা মাসে ৫০০ টাকা
সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে শিক্ষা সহায়তা ভাতা দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসে এক হাজার টাকা পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই সরকারি কর্মচারী হলে সন্তানের সংখ্যা যে কোনো একজনের ক্ষেত্রে গণনা করে ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। বয়সের সনদপত্র অনুযায়ী ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের জন্য এ ভাতা প্রযোজ্য হবে।
 
টিফিন ও দায়িত্ব ভাতাও থাকছে

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কোনো কর্মচারী প্রতিষ্ঠান থেকে দুপুরের খাবার বা খাবারের ব্যবস্থা পেলে তার ক্ষেত্রে টিফিন ভাতা প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা দায়িত্ব ভাতার বিধান রাখা হয়েছে।

উচ্চতর গ্রেডেও নতুন বিধান
নতুন পে স্কেলে কোনো পদে আট বছর টানা চাকরি করার পর পদোন্নতি না পেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। এই প্রথম সুবিধাটি পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর পার করলে দ্বিতীয়বারের মতো মিলবে উচ্চতর গ্রেড। তবে একটি পদে চাকরির পুরো সময়ে সর্বোচ্চ দুবার এ সুবিধা গ্রহণ করা যাবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow