দেড় দশকে দেশে আমদানি বেড়েছে ২৬৬ শতাংশ

Sep 20, 2026 - 12:50
 0  4
দেড় দশকে দেশে আমদানি বেড়েছে ২৬৬ শতাংশ

অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতাও। গত দেড় দশকের তথ্য বলছে, শুধু আমদানির পরিমাণ নয়, বদলে গেছে আমদানির ধরনও। ২০০৯-১০ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৭ গুণ। একই সময়ে এসব পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ গুণ। খাদ্য থেকে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল থেকে নির্মাণসামগ্রী— বিদেশি পণ্যের প্রবাহ বেড়েছে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে।

এই পরিবর্তনের গুরুত্ব আরও গভীর। দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। মোট আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি এ বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের দীর্ঘমেয়াদি আমদানি-তথ্য একটি বন্দরের পণ্যপ্রবাহের হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ২০০৯-১০ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আমদানি-তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের নিট ওজন ছিল ২ কোটি ৯২ লাখ ৭২ হাজার ৭২৬ টন। এরপর ক্রমান্বয়ে বেড়েছে আমদানির চিত্র। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ বিদায়ী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৭১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৯৭ টনে। অর্থাৎ ১৬ বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ২৬৬ শতাংশ বা প্রায় ৩ দশমিক ৭ গুণ।

একই সময়ে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১ লাখ ৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল্যমান বেড়েছে প্রায় ৪৫০ শতাংশ বা সাড়ে ৫ গুণ। ফলে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক পণ্যনির্ভর অর্থনীতির আর্থিক পরিসরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে গত দেড় দশকে সব ধরনের পণ্যের আমদানি একই হারে বাড়েনি। কোনো কোনো পণ্যগোষ্ঠীর আমদানি কয়েক গুণ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে খনিজ ও জ্বালানি এবং লোহা-ইস্পাত ও বেস মেটালজাত পণ্যে।

সেকশনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জ্বালানি ও বেস মেটালে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন। এইচএস কোডের ২৫ থেকে ২৭ নম্বর অধ্যায়ের পণ্য নিয়ে গঠিত (ইমপোট-২) সেকশনে রয়েছে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম, কয়লা, লবণ, সালফার, পাথর, চুন ও সিমেন্ট তৈরির ক্লিংকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য।

২০০৯-১০ অর্থবছরে এই শ্রেণির আমদানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২৬ লাখ ৫৮ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ কোটি ১ লাখ ৯৪ হাজার টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ওজনের হিসাবে বেড়েছে ৩৭৫ দশমিক ৫২ শতাংশ বা প্রায় ৪ দশমিক ৮ গুণ। একই সময়ে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৪ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা হয়েছে, যা প্রায় ৮ দশমিক ৫ গুণ। শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি এর সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, একই সঙ্গে এটি দেশের জ্বালানি আমদানি নির্ভরতার একটি বড় চিত্রও তুলে ধরে।

শিল্পের কাঁচামালের পাশাপাশি খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। (ইমপোর্ট-১এ ও ১বি) সেকশনে জীবন্ত প্রাণী, মাছ, মাংস, ডাল, পেঁয়াজ, মসলা, ভোজ্যতেল, চাল, গম, দুগ্ধজাত পণ্য, ফলমূল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও তামাকজাত পণ্য রয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ শ্রেণিতে আমদানি হয়েছিল ৭২ লাখ ৩৭ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার টন। অর্থাৎ ওজনের হিসাবে প্রায় আড়াই গুণ। মূল্য বেড়েছে ২৪ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকায়। জনসংখ্যা, নগরায়ণ ও খাদ্যচাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকা পণ্যেও বিদেশিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে— এই প্রবণতাকে তাই শুধু ভোগ বৃদ্ধির হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় আমদানির ভূমিকা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পের কাঁচামালেও আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশ তীব্র। তুলা, সুতা, কাপড়, পোশাকের আনুষঙ্গিক উপকরণসহ এই শ্রেণির আমদানি ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৭৬ হাজার ৩৯৮ টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ১০ হাজার ৭৩৫ টনে পৌঁছেছে। ওজনের হিসাবে প্রবৃদ্ধি ১৭৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। কিন্তু মূল্য বেড়েছে ১ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা থেকে ১১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকায়। এই প্রবৃদ্ধি ৫৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এদিকে রাসায়নিক পণ্যের আমদানিও বেড়েছে, যদিও ওজনের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৫৩০ টন থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ আমদানি বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টন। ওজন বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ, কিন্তু মূল্য বেড়েছে ২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা থেকে ৮ হাজার ১০ কোটি টাকায়, প্রবৃদ্ধি ২৩৭ শতাংশের বেশি। শিল্প, ওষুধ, কৃষি, প্রসাধন, রং ও অন্যান্য উৎপাদন খাতে রাসায়নিকের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পণ্যের অংশ বাড়ার বিষয়টিও এখানে বিবেচনায় আসে। এছাড়া চামড়া, কাঠ, কাগজ ও মুদ্রণসংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ৩ লাখ ৪৮ হাজার টন থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৫৩ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। আবার জুতা, সিরামিক, কাচ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের কয়েকটি সেকশনেও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবেও আমদানির ব্যাপকতা স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য আমদানি এফওবি ভিত্তিতে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমে ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ফলে ওই অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সাম্প্রতিক এক বছরে আমদানির প্রবৃদ্ধি যেখানে দুই অঙ্কে ছিল, সেখানে রপ্তানি বাড়েনি। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এই দীর্ঘ সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ৬ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ২০২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২৮ বছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৬৬ গুণ। তবে রাজস্ব বৃদ্ধির চেয়ে বড় বিষয় হলো এর পেছনে থাকা পণ্যপ্রবাহ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে যেখানে বছরে প্রায় ২ কোটি ৯৩ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ছাড়িয়েছে ১০ কোটি ৭১ লাখ টন। আর সর্বশেষ এক বছরেই আমদানির নিট ওজন বেড়েছে ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯ কোটি ৩৯ লাখ টন থেকে তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ১০ কোটি ৭২ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সময়ে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বেড়েছে ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়লেও সে অনুযায়ী দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে বাড়তি চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিশেষ করে কৃষিজমি কমে যাওয়ায় কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে জমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে কৃষির পরিধি সংকুচিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানির ওপর।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ভোগ্যপণ্য নয়, দেশের শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেও আমদানিনির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনায় দৃশ্যমান ব্যয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের অপ্রত্যক্ষ খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদনের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর ব্যবসা তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠছে।’

ড. মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতে, আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও বাড়ছে। অতিরিক্ত আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং দেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝাও বাড়ছে। তাই আমদানি বাড়ছে কি না— এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কী ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে এবং সেই আমদানি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি আয় কতটা বাড়াচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow